বুশরা মাহমুদা
ছুটি শুরু হলেই যেন মনটা একটু অন্যরকম হয়ে যায়। আর যদি সেটি হয় ঈদের ছুটি, তার ওপর আবার লম্বা ছুটি তবে তো আনন্দের ঢেউ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাগ গোছানো, কেনাকাটা, আপন মানুষদের জন্য ছোট ছোট উপহার সবকিছু নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমরা। চোখের কোণায় জমে ওঠে এক ধরনের উচ্ছ্বাস। মনে হয়, আর ক’টা দিন। তারপরই দেখা হবে আপনজনদের সঙ্গে। ঈদ আসলে এক বিশাল মিলনমেলা। আত্মীয়-স্বজন, ভাই-বোন, বাবা-মা, সন্তান, বন্ধু সবাইকে ঘিরে এক রঙিন সময়। হাসি, গল্প, আলিঙ্গন আর স্মৃতির ভেতর দিয়ে ঈদ হয়ে ওঠে এক অপার আনন্দের উৎসব।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এমন হয় না। সবাই সেই মিলনমেলার অংশ হতে পারে না। অনেক মানুষ আছেন, যারা নানা কারণে একাকী ঈদ উদযাপন করেন। কেউ সিঙ্গেল জীবনের কারণে একা থাকেন, কেউ শারীরিক অসুস্থতার কারণে দূরে কোথাও ভ্রমণ করতে পারেন না, আবার কেউ জরুরি পেশাগত দায়িত্বের কারণে পরিবারের কাছে ফিরতে পারেন না। ঘরে বসে কাজের ফাঁকে আমরা যখন মোবাইল হাতে নিই, তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ চোখে পড়ে কোনো পরিচিত গান বা ভিডিও—

“স্বপ্ন টানে, দিলাম পাড়ি অচিন পথে আপন ছাড়ি…
এই তো সময় ফিরে আসার, স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার…”
ভিডিওটি বারবার সামনে আসে। আর অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। বুকের ভেতর যেন হালকা একটা হাহাকার জেগে ওঠে। মনে প্রশ্ন জাগে, আমি কেন এই অবস্থানে? কেন আজ ঈদের দিনে আমি দূরে? ঠিক তখনই মনকে ঘিরে ধরে এক ধরনের পাওয়া–না-পাওয়ার অনুভূতি। মনে হয়, যেন জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে দেখাও সম্ভব। একা ঈদ মানেই যে কেবল দুঃখ বা অপূর্ণতা তা নয়। কখনও কখনও একা সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। এই সময় আমাদের নিজেদের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে বোঝার সুযোগ দেয়। একাকীত্বের ভেতরেও থাকে আত্মপরিচয়ের সম্ভাবনা, আত্মযত্নের জায়গা এবং নিজের ভেতরের নীরব শক্তিকে আবিষ্কার করার সুযোগ।
যারা সিঙ্গেল জীবন যাপন করেন, তাদের জন্য ঈদের সময়টি কখনও কখনও একটু বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। কারণ চারপাশে যখন সবাই পরিবার, দাম্পত্য বা সম্পর্কের উষ্ণতায় ঘেরা থাকে, তখন নিজের একাকীত্বটি বেশি চোখে পড়ে।থেরাপিউটিকভাবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোএকাকীত্ব এবং নিঃসঙ্গতা এক জিনিস নয়। একাকী থাকা একটি বাস্তব অবস্থা, কিন্তু নিঃসঙ্গতা একটি মানসিক অনুভূতি। যদি কেউ নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণভাবে দেখতে পারেন বন্ধু, কাজ, সৃজনশীলতা বা ব্যক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে তবে একা ঈদও সুন্দরভাবে কাটানো সম্ভব।
সিঙ্গেল মানুষের জন্য কিছু ছোট উদ্যোগ হতে পারে—
নিজের জন্য বিশেষ একটি ঈদের সকাল তৈরি করা
নতুন পোশাক পরে নিজেকে উদযাপন করা
বন্ধু বা প্রিয় মানুষের সঙ্গে অনলাইন বা সরাসরি যোগাযোগ করা
নিজের পছন্দের খাবার রান্না করা বা অর্ডার করা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজেকে এই অনুভূতি দেওয়া যে জীবন কেবল একটি সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতা মানুষকে ভ্রমণ বা সামাজিক অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখে। তখন ঈদের আনন্দ যেন কিছুটা থমকে যায়। এখানে মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্ব-সহমর্মিতা (self-compassion)। অসুস্থতার সময়ে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া খুব জরুরি। আমরা অনেক সময় নিজেকে দোষ দিই “আমি কেন যেতে পারলাম না?”, “আমি কেন এমন অসুস্থ হলাম?” অথচ এই সময়টিতে নিজের প্রতি যত্নই সবচেয়ে প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে কিছু ছোট পদক্ষেপ সাহায্য করতে পারে—
শরীরের যত্ন নেওয়াকে ঈদের অংশ হিসেবে দেখা
প্রিয় বই, গান বা সিনেমার সঙ্গে সময় কাটানো
পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলের মাধ্যমে সংযোগ রাখা
ঈদের দিনটিকে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের দিন হিসেবে গ্রহণ করা
মনে রাখতে হবে, সুস্থ হয়ে ওঠাও এক ধরনের উদযাপন।
অনেক মানুষ আছেন, যারা জরুরি পেশাগত দায়িত্বের কারণে ঈদের সময় বাড়ি যেতে পারেন না যেমন চিকিৎসক, নিরাপত্তাকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী বা বিভিন্ন সেবামূলক পেশার মানুষ। তাদের জন্য ঈদ মানে অনেক সময় দায়িত্বের মাঝেই উৎসবকে খুঁজে নেওয়া। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এখানে “meaningful work” বা অর্থপূর্ণ কাজের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন মানুষ বুঝতে পারেন যে তার কাজ অন্য মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে, তখন সেই দায়িত্বের ভেতরেও এক ধরনের তৃপ্তি তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে ঈদকে উপভোগ করার কিছু উপায় হতে পারে—
সহকর্মীদের সঙ্গে ছোট্ট ঈদ মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া
কাজের ফাঁকে প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা
দিনের শেষে নিজের জন্য একটি ছোট উদযাপন রাখা
এতে করে দায়িত্বের মাঝেও উৎসবের অনুভূতি জীবিত থাকে।
একাকী ঈদ মানেই যে আনন্দহীন ঈদ এ ধারণাটি সবসময় সত্য নয়। কখনও কখনও একা সময় কাটানো আমাদের নিজের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করে। ঈদের দিনটি নিজের জন্য সুন্দর করে সাজানো যায়।
যেমন—
নিজের জন্য সময় রাখা
কৃতজ্ঞতার অনুভূতি চর্চা করা
প্রার্থনা ও আত্মচিন্তার মুহূর্ত তৈরি করা
অন্য কারও জন্য ছোট একটি সহানুভূতির কাজ করা
কারণ আনন্দ সবসময় ভিড়ের ওপর নির্ভর করে না; অনেক সময় তা নিজের ভেতর থেকেই জন্ম নেয়। ঈদের আসল বার্তা হলো সংযোগ, সহমর্মিতা এবং কৃতজ্ঞতা। কখনও সেই সংযোগ পরিবার ও মানুষের সঙ্গে হয়, আবার কখনও নিজের সঙ্গেও হয়। তাই যদি কোনো কারণে আপনার ঈদ একাকী হয়, তবুও মনে রাখুন—
এই দিনটিও আপনার।
এই আনন্দটুকুও আপনার প্রাপ্য।
নিজের প্রতি যত্ন নিন, নিজের সঙ্গে থাকুন, এবং নিজের ভেতরের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে খুঁজে নিন।
তবেই একাকী ঈদও হয়ে উঠতে পারে শান্ত, গভীর এবং অর্থপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা।
এই ব্লগের একমাত্র উদ্দেশ্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে এতে কিছু প্রতীকি ঘটনা ব্যবহার করা হয়েছে।
এই ব্লগ বা এর কোনো অংশ পড়ে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে তার জন্য লেখক ও ‘মনের বন্ধু’ দায়ী নয়। মনের ওপর চাপ অনুভব করলে বা মানসিকভাবে ট্রিগার্ড অনুভব করলে দ্রুত মনের বন্ধু বা যেকোনো মানসিক স্বাস্থ্যবিদের সাথে যোগাযোগ করুন।
মনের বন্ধুতে কাউন্সেলিং নিতে যোগাযোগ করুন: ০১৭৭৬৬৩২৩৪৪।
📍: ৮ম ও ৯ম তলা, ২/১৬, ব্লক-বি, লালমাটিয়া, ঢাকা
we forget to understand the correlation between our mental health and physical health. Besides just taking care of our physical health, taking care of our mental health is just as important.
জীবনে সব সময় আনন্দ থাকে না। ভালো এবং খারাপ দুটি অনুভূতি নিয়েই আমাদের জীবন। অনেক কঠিন সময়ে আমাদের অস্থির লাগে। কিছুই যেন সে সময় ভালো লাগেনা। মনে হয় সবকিছু ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই। আপনারও কি এমন মনে হয়?
আয়ান (ছদ্মনাম) সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতা নিয়ে তার মায়ের ছিল তীব্র মনোযোগ-যে কোনো কিছু একটু নোংরা বা এলোমেলো দেখলেই তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন।
আমাদের জীবনের চলার পথ র্যাম্পে হাঁটার পথের মতো মসৃণ হয় না। অর্থাৎ আমরা সব সময় মসৃণ পথ পাই না, আবার সব জুতা পরে সব রাস্তায় হাঁটাও যায় না। অমসৃণ, কর্দমাক্ত ও অসমতল পথ হলে অনেক সময় জুতা হাতে করেও হাঁটতে